মঙ্গলবার মে ২৬, ২০২০ || ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ে পল্টনের বাসায় ছিলাম

খবর২৪ডেস্ক

‘১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ে পল্টনের বাসায় ছিলাম। পুরানা পল্টন লাইনে আমাদের বাড়ি। বয়স তখন ১৮। আমি, বাচ্চু [নাসির উদ্দীন ইউসুফ] একসঙ্গেই ছিলাম। পাশাপাশি বাড়ি আমাদের। ২৫ মার্চ রাতে হঠাৎ গুলির শব্দ শুনতে পাই। তখন বাড়িঘর কম ছিল এদিকে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, রাজারবাগ পুলিশ লাইনের দিক থেকেই গুলির শব্দ আসছে। আমরা দেখার জন্য এগিয়ে যাই। জানতে পারি, পাকিস্তান আর্মি অ্যাটাক করেছে। তারপর আরও গুলি চলে। চারপাশে শুধু গুলি আর গুলি। সারারাত গুলির শব্দ। কাছ থেকে না শুনলে কেউ বুঝতে পারবে না, কী ভয়াবহ ছিল সেই শব্দ! এর পর চিৎকার ভেসে আসে। নির্ঘুম রাত কাটে আমাদের।’ স্মৃতির ঝাঁপি খুলে ১৯৭১ সালের ঘটনা এভাবেই বলে গেলেন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ও নন্দিত অভিনয়শিল্পী রাইসুল ইসলাম আসাদ। সম্প্রতি পল্টনের বাসায় কথা হয় শিল্পীর সঙ্গে। বলেছেন মুক্তিযুদ্ধ এবং জীবনের নানা বাঁক বদলের গল্প। লিখেছেন সমু সাহা

রাজধানীর পুরানা পল্টনে রাইসুল ইসলাম আসাদের পৈতৃক নিবাস। সেখানেই তার বেড়ে ওঠা। ছোটবেলায় দুরন্তপনা, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোতেই খুঁজে পেতেন আনন্দ। এই শহরের আলো-বাতাস অঙ্গে মেখেছেন পরম ভালোবাসায়। নাসির উদ্দীন ইউসুফের সঙ্গে কেটেছে শৈশবের বড় একটা অংশ। দু’জনের বাড়ি পাশাপাশি। তাদের বন্ধুত্বও ঠিক তেমনই। শৈশব পেরিয়ে তারুণ্য, মুক্তিযুদ্ধ এমনকি শিল্পসঙ্গী হিসেবে এখনও তারা একই তরীর যাত্রী। ১৯৫৩ সালে জন্মগ্রহণ করা রাইসুল ইসলাম আসাদ জীবনকে সরল রৈখিকভাবে দেখতেই পছন্দ করেন। তাবে তার জীবনরেখার ছন্দে বাদ সাধে ১৯৭১ সাল। সামনে আসে ২৫ মার্চের বিভীষিকাময় রাত। আজও তিনি ভুলতে পারেননি সে রাতের ভয়াবহতা। চোখের সামনে দেখেছিলেন অগণিত লাশ। আকাশে আর্তনাদ, বাতাসে লাশের গন্ধ। সারা রাত নির্ঘুম কাটে। কেটে যায় আরও একদিন। ‘২৫ মার্চ রাতের হামলায় অনেক মানুষ মারা যায়। কী ভয়াবহ আক্রমণ তারা করেছিল! কী জঘন্য হামলা তারা চালিয়েছিল! ইতিহাস সাক্ষী। আমরাও সাক্ষী। মনের ভেতর ভীষণ জেদ চাপে- রক্তের বিনিময়ে রক্ত দিয়েই এ দেশকে শত্রুমুক্ত করতে হবে।’

রণাঙ্গনের দিনগুলো

সময়ের সঙ্গে জীবনের আদল বদলায়। কিন্তু স্মৃতিকোঠায় মুক্তিযুদ্ধের ঘটনায় এতটুকু ধুলো পড়তে দেননি রাইসুল ইসলাম আসাদ। এখনও তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর মনে অনুরণন তোলে। তারুণ্যদীপ্ত মানুষটি মুক্তিযুদ্ধ থেকেই সঞ্চয় করেন জীবনীশক্তি। প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আগে নিজেকে শানিত করতে পাড়ি দিতে হয়েছে কণ্টকাকীর্ণ পথ। আর সেই পথ চোখের সামনে আরও একবার ভেসে ওঠে। বলেন, ‘১৯৭১ সালে এপ্রিল মাসের দিকে আমি কেরানীগঞ্জ চলে যাই। সেখান থেকে চট্টগ্রাম হয়ে আগরতলায় পৌঁছি। নাসির উদ্দীন ইউসুফ, কাজী শাহাবুদ্দিন শাহজাহানও সঙ্গেই ছিলেন। তবে আগরতলায় যেতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল। এক জায়গায় ব্রিজ ভাঙা ছিল। সে কথা মনে পড়লে এখনও গা শিউরে ওঠে। এত ভাবনা তখন মাথায় কাজ করেনি। একটাই চিন্তা- ট্রেনিং নিয়েই যুদ্ধে নামতে হবে। আগরতলায় পৌঁছার পর মেলাঘরে ট্রেনিং শুরু হলো। সেখান থেকে কলকাতা যাই একবার। তারপর উত্তর দিনাজপুর হয়ে আবার ফিরে যাই আগরতলায় মেলাঘরে ট্রেনিং নিতে। এক সময় ট্রেনিং শেষ হয়। আমরা ঢাকায় ফিরে আসি। শুরু হয় দেশের জন্য যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে আমি ঢাকার উত্তর বাহিনীতে ছিলাম। কমান্ডার ছিলেন রেজাউল করিম মানিক ভাই। মানিকগঞ্জে একটি ব্রিজ অপারেশনে গিয়ে তিনি শহীদ হয়েছিলেন। পরে নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু আমাদের কমান্ডার হলেন। আমাদের মেইন ক্যাম্প ছিল মানিকগঞ্জে। ঢাকায় উত্তর বাহিনীর ছোট একটা ইউনিট ছিল। যখন দেশ স্বাধীন হয়, তখন ওই ইউনিটের দায়িত্বে ছিলাম আমি। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ঢাকায়ই ছিলাম। মাঝে একবার ক্যাম্পে গিয়েছিলাম, যেদিন ভারত এয়ার অ্যাটাক করে। ১৫ ডিসেম্বর রাতে গুলবাগে এক বোনের বাসায় ছিলাম। যখন এয়ার অ্যাটাক হয়ে গেল তখনই বুঝলাম, কিছু হতে যাচ্ছে। আমাদের কাছে আগেই খবর এসেছে। নির্দেশনা ছিল, ঢাকার আশপাশে যারা আছে তারা যেন ঢাকার দিকে ঢুকতে থাকে। অ্যাটাক করতে করতে এগোতে হবে। মনের মাঝে শত্রু দমনের স্পৃহা যেন আকাশ ছুঁলো।

বিজয়ের রাঙা সকাল

১৬ ডিসেম্বরের সকাল রাইসুল ইসলাম আসাদের কাছে অদ্বিতীয়। সারাদেশে বিজয়ের সৌরভ তখন ছড়িয়ে পড়ছে। গৌরবোজ্জ্বল সে দৃশ্যপট এখনও তার চোখের সামনে মূর্তমান। তাতে ডুব দিতে দিতেই বলেন, ১৬ ডিসেম্বর সকালে ঢাকার রাস্তাঘাট পুরো ফাঁকা ছিল। মালিবাগের মোড়ে গিয়ে দেখি, মাঝেমধ্যে একেকটা আর্মির গাড়ি বা ট্রাক আস্তে-ধীরে চলে যাচ্ছে। মেইন রোডের কাছাকাছি চলে আসার পর দেখি অদ্ভুত কিছু মানুষ। ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় যাদের আটকে রেখেছিল, টর্চার করেছিল, তারা বেরিয়ে এসেছেন। মানসিকভাবে তারা বিক্ষিপ্ত। তখনও বুঝতে পারছিলাম না কী হচ্ছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে মাইকে ঘোষণা হচ্ছিল- দেশ স্বাধীন হচ্ছে। দুপুর থেকেই হুলস্থুল পড়ে গেল। ভারতীয় আর্মিরা ট্যাঙ্ক নিয়ে ঢুকল। মানুষজন রাস্তায় বের হতে থাকল। আমাদের একটা ক্যাম্প ছিল নবরত্ন কলোনিতে, এখন যেটা বেইলি রোড; ৪ নম্বর বাড়িতে। আরেকটা ক্যাম্প ছিল ফকিরাপুলে। এগুলো গোপন আস্তানা। ওখান থেকে আমরা বিভিন্ন অপারেশনে যেতাম। ওই পরিবারের এক মেয়ে সেদিন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের ওখানে গুলিবিদ্ধ হয়। দুপুরের মধ্যে জানা গেল, পাকিস্তানি আর্মি সারেন্ডার করবে রেসকোর্স ময়দানে। বিকেলের দিকে গেলাম পল্টনে, আমার বাড়িতে। রাতে খবর এলো, আমাদের কমান্ডার নাসির উদ্দীন ইউসুফ দল নিয়ে ঢাকায় এসেছেন। তখন রাত ৯টার মতো হবে। ৫২ জনের টিম ছিল আমাদের। পরে আমরা চারটি টিমে ভাগ হয়ে গিয়েছিলাম। লোকাল লোকও রিক্রুট করতাম। ওদের সবাইকে ঢাকায় আনা হবে। সেই রাতেই গাড়ি জোগাড় করলাম আমরা। আমাদের সঙ্গের অনেকেই শহীদ হয়েছেন। তাদের কথা সেদিন খুব মনে পড়েছিল।

হঠাৎ বাঁকবদল

রাইসুল ইসলাম আসাদ ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি, জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে মুক্তিযোদ্ধার পাশাপাশি নিজেকে ‘শিল্পী আসাদ’ হিসেবে আবিস্কার করবেন। ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধ শেষে সবে নিজের এলাকায় [পুরানা পল্টন] ফিরেছেন। বিজয়-পরবর্তী সময়ে সাকিনা সারোয়ার [বিটিভির প্রযোজক] সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন মগবাজার মাঠে। পূর্বপরিচয়ের সূত্র ধরেই তাতে ডাক পড়ে রাইসুল ইসলাম আসাদের। সে অনুষ্ঠানে তাকে ধারাবর্ণনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু এ কথা শুনেই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আপত্তি জানান তিনি। বন্দুক হাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে বিনাশ করা মানুষটি মাইক্রোফোন হাতে নিতে কিছুটা ইতস্তত বোধ করেছিলেন। এ কথা মনে আসতেই স্মিত হেসে তিনি বলেন, “ঢাকার পল্টন, মগবাজারে একাত্তরে আমরা অপারেশন চালিয়ে ছিলাম বলে এসব এলাকায় পরিচিতি, দাপটও ছিল বেশি। আমাদের দলের ফেরদৌস নাজমী, সোহেল সামাদ, ফিরোজ, আরিফসহ কয়েকজন সে পরিকল্পনায় যুক্ত হলো। সোহেল এসে ধরল, এই অনুষ্ঠানে গীতিনকশা হবে। তাতে নাচ, গান আবৃত্তির অংশবিশেষ থাকবে। আমাকে সেটির ধারা বর্ণনা দিতে হবে। নাছোড়বান্দা সোহেলের জোরাজুরিতে রাজি হতে হলো। শর্ত দিলাম, ‘কোনোভাবেই আমাকে যেন দর্শক দেখতে না পায়, কাউকে কিছু বলা যাবে না।’ তখন সে বুদ্ধি করল, ‘মাইক্রোফোনের সামনে আমি দাঁড়াব। আলো আমার ওপর পড়বে। আর আপনি আড়ালে থেকে পড়বেন। আপনার জন্য মাইক্রোফোনটি মঞ্চের পেছনে ফিট করে দেওয়া হবে।’ অনুষ্ঠান শুরুর পর মঞ্চের পেছনে ঘুটঘুটে আঁধার। সোহেলের ওপর আলো পড়ছে! দর্শক ধারাবর্ণনার অপেক্ষা করছেন! বারবার সে পেছনে তাকাচ্ছে; কিন্তু আমি তো অসহায়। পরে কেউ একজন হঠাৎ একটি টর্চ এগিয়ে দিলেন। সেই আলোয় গীতিনকশা পাঠ করলাম। সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী, বাচ্চুসহ অনেকে সেদিন উপস্থিত ছিলেন। পরে তাদের অনেকের প্রশ্ন ছিল- ‘দরাজ কণ্ঠটি কার?’ সোহেল যতবারই বলে, ‘আমার’, কেউ বিশ্বাস করেন না। নাম বললে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়ায় সে নামটিও বলতে পারছিল না। স্বাধীনতার পর সমম্ভবত ঢাকারও প্রথম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল এটি। এর পরের বছর কৌণিক শিল্পীগোষ্ঠীর হয়ে জাকী ভাই বড় করে অনুষ্ঠান করা পরিকল্পনা করলেন। সে জন্য তার বাসায় আমাদের প্রায়ই রিহার্সাল হতো। আর সেখানে তিনি প্রায়ই সোহেলকে চাপ দিতেন ওই কণ্ঠস্বরটি কার, তা বলার জন্য। একদিন সোহেল বলেই ফেলল, ‘আসাদ ভাইয়ের কণ্ঠ ছিল সেটি।’ এটি বলেই সে দৌড়ে পালাল। আর এদিকে জাকী ভাই আমাকে বললেন, ‘কাল একটু সকাল সকাল এসো, কাজ আছে।’ সকালে আসার পর তিনি আমার কণ্ঠস্বর টেপ রেকর্ডারে নিয়ে নিলেন। পরে একুশের অনুষ্ঠানমালায় অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু আমি শর্ত জুড়ে দিলাম- ‘দর্শক যদি আমাকে না দেখে তবেই অংশ নিতে পারি।’ উপায়ান্তর না পেয়ে তিনি রাজিও হলেন।”

১৯৭২-৭৩ এর দিকে সালাহউদ্দীন জাকী ও নাসির উদ্দীন ইউসুফের সঙ্গেই বেশি যোগাযোগ ছিল রাইসুল ইসলাম আসাদের। রাতভর আড্ডা, ঘুরে বেড়ানোসহ কত কী! বহুবচনে [থিয়েটার দল] সালাহউদ্দীন জাকী ও নাসির উদ্দীন ইউসুফ কাজ করতেন। তাদের সঙ্গে মূলত আড্ডা দিতেই শিল্পকলায় যেতেন তিনি। সে স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, “টিন সেড অফিস ঘরের চেয়ার-টেবিল সরিয়ে রিহার্সাল হতো। ওদের সঙ্গে আমিও রিহার্সালের আগে ঘর ঝাড়ূ দিই, মেঝে পরিস্কার করি; চা, এটা-ওটা এনে দিই। কিন্তু অভিনয়ের ইচ্ছা কখনও হয়নি। তখন শিল্পকলায় আলাদা দুটি কক্ষে সেলিম আল দীনের ‘সর্পবিষয়ক গল্প’ ও ফজলুর রহমানের ‘আমি রাজা হবো না’র রিহার্সাল চলছিল। একদিন রেস্তোরাঁর বেয়ারার চরিত্রাভিনেতা আসতে পারলেন না। নাটকে একটিমাত্র দৃশ্য করার জন্য আমাকে প্রস্তাব করা হলো। আমি বেঁকে বসলাম, ‘অভিনয় করতে পারব না। দর্শকের সামনে দাঁড়ানোর সাহস নেই।’ আমিরুল ভাই বোঝালেন, ‘শুধু এগিয়ে গিয়ে টেবিলের ওপর থেকে চায়ের কাপটি তুলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসবে।’ বললাম, ‘সামনে দিয়ে যেতে পারব না।’ তারা তাতেই রাজি। কিন্তু পরদিনও ছেলেটি এলো না। তখন তারা আমাকে দিয়ে দৃশ্যটি আবার করালেন। এর পর বললেন, ‘দুই শব্দের সংলাপও দিতে হবে।’ আমার মেজাজ তখন চড়ে গিয়েছিল। এভাবে একটু একটু করে আমাকে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করতে বলা হয়। শেষ পর্যন্ত নাটকটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করি।”

‘বহুবচন’-এর পর আরণ্যক নাট্যদল ‘ড্রামা সার্কেল’-এ নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগে পড়াশোনার সময় সেখানকার থিয়েটার দল নাট্যচক্রেও কাজ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যচর্চার সূত্র ধরে সেলিম আল দীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে তার। নাট্যচার্য সেলিম আল দীন তখন একই বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে অধ্যাপনায়। বয়সে রাইসুল ইসলাম আসাদ তার ছোট হলেও দু’জনের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো।

এরপর ১৯৭৩ সালে তিনিসহ সেলিম আল দীন, নাসির উদ্দীন ইউসুফ ও আরও বেশ কয়েকজনের সম্মিলিত প্রয়াসে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা থিয়েটার। শুরু হয় রাইসুল ইসলাম আসাদের জীবনের আরেক অধ্যায়। ঢাকা থিয়েটারের হয়ে ‘সংবাদ কার্টুন’, ‘সম্রাট ও প্রতিদ্বন্দ্বীগণ’ শিরোনামে দুটি নাটকে প্রথম কাজ করেন। এরপর ‘বিদায় মোনালিসা’, ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’, ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’, ‘শকুন্তলা’, ‘কীত্তনখোলা’,’কেরামতমঙ্গল’, ‘চাকা’, ‘হাতহদাই’সহ আরও অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছেন। যার বেশিরভাগ নাটকে রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন সেলিম আল দীন। ঢাকা থিয়েটারের সে সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘আমার জীবনে ঢাকা থিয়েটার বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ওই সময় কাজ করতে গিয়ে আমরা কত হৈ-হুল্লোড় করতাম। তখনকার সময়ে ঢাকা থিয়েটারে বেশিরভাগ নাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ হয়েছিল।’

সেলুলয়েডে নিজের অবয়ব

ছিমছাম গোছানো বাড়ির সিঁড়ি থেকে শুরু করে অন্দরমহল পর্যন্ত অভিনীত বিভিন্ন চরিত্রকে ফ্রেমবন্দি করে রেখেছেন বরেণ্য এ শিল্পী। ড্রইংরুমে সাজানো শিল্পী জীবনের অর্জনস্বরূপ বিভিন্ন পদক। ১৯৭৩ সালে খান আতাউর রহমানের ‘আবার তোরা মানুষ হ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে সিনে-দুনিয়ায় তার পদার্পণ। এ সিনেমায় অভিনয়ের স্মৃতি এখনও রাইসুল ইসলাম আসাদের মনে জ্বলজ্বল করে। নিজেই জানান, ‘অভিনয়’ কিংবা ‘অভিনয়শিল্পী’ বিষয়টি তখনও তার ধাতে ছিল না। সবকিছু কেমন যেন দ্রুত ঘটতে থাকল! বলেন, “আতা ভাই [খান আতাউর রহমান] ‘আবার তোরা মানুষ হ’ সিনেমার জন্য অনেক শিল্পী খুঁজছিলেন। বিটিভির পরিচিতরা আমার ও আল মনসুরের নাম প্রস্তাব করেন। ১৯৭৩ সালের শুরুর দিকে তার বিজয়নগরের অফিসে গেলাম। তখনও অভিনয় কী, কেন, কোথায় করছি- এত বোধ মাথায় ঢোকেনি। পাগলের মতো কাজ করছি। কথা বলার পর ছবির সাত মুক্তিযোদ্ধার একজন হয়ে অভিনয় শুরু করলাম।পরে সে বছরের ১৬ ডিসেম্বর ছবিটি মুক্তি পেল।”

এর পর ১৯৮০ সালে সালাহউদ্দীন জাকীর ‘ঘুড্ডি’, ১৯৮১ সালে সৈয়দ হাসান ইমামের ‘লাল সবুজের পালা’, ১৯৮৪ সালে কাজল আরেফিনের ‘সুরুজ মিঞা’সহ ‘মানে না মানা’, ‘নয়নের আলো’, ‘নতুন বউ’, ‘রাজবাড়ি’, ‘মীমাংসা’, ‘আয়না বিবির পালা’, ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘অন্য জীবন’, ‘লালন’, ‘লালসালু’, ‘ঘানি’, ‘মৃত্তিকা মায়া’সহ ৫০টির অধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন রাইসুল ইসলাম আসাদ মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন সিনেমাপ্রেমীদের। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য এখন পর্যন্ত তিনি ছয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘অন্য জীবন’, ‘লালসালু’, ‘দুখাই’, ‘ঘানি’ ও ‘মৃত্তিকা মায়া’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি এ সম্মাননা লাভ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *