বৃহস্পতিবার সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭ || ৬ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

 আমার বাংলা চাই …..    সৈয়দ মোশারফ

 

জীবনের প্রথম অভিনয় ,প্রথম চিত্রনাট্য । যতদূর মনে পরে সেটাই আমার প্রথম অভিনয় আর আগের গুলো মনে নেই ।উত্তাল তখন বাংলা । পথে চলছে মিছিল আর মিছিল ।বাংলা চাই,ছয় দফা মানতে হবে ,এগার দফা মানতে হবে । নানা রকম স্লোগান সারা বাংলায় । কিন্তু আমার মাথায় একটা শব্দ পাকাপোক্ত ভাবে গেঁথে গেছে ‘বাংলা চাই’। একটা চায়ের দোকানে একটা লোক বলছিল ‘ আমার বাংলা আমার হাতে ফেরত চাই’,বাংলা চাই…… অন্য কিছু মানি না,মানব না ।’ সেই মানুষটার কথা আমাকে এখন নানা রূপে নানা রঙে ভাবায় , আজ পঞ্চাশ পেরিয়েও এর উত্তর সঠিক ভাবে মেলাতে পারিনি । সেই উত্তাল বাংলায় প্রতিটি মানুষ যেন সেই লোকটার মত টগবগ  করছে । আমার ছোট্ট মাথায় খেলছিল না এই লোকটা তার ছোটো হাতে বাংলা দেশটাকে কেমন করে ধরে রাখবে ,কতটুকু ধরে রাখতে পারবে ? নিজে নিজে মহড়া করলাম দেখি আমি কতটুকু বাংলাকে ধরে রাখতে পারি । একবার বালি দিয়ে হাতের মুঠো ভরি ।একবার কাদা মাটি দিয়ে দু হাত ভরে ফেলি । একবার আস্ত একটা গাছের গুড়ি তুলতে চেষ্টা করি । সেটাই কিন্তু আমার প্রথম অভিনয়ের চেষ্টা , পাকা পোক্ত অভিনয় সেই সময়ের মধ্যেই ।

যে করেই হোক ঠাকুরের রসগোল্লা রাজভোগ প্রতিদিন খেতে হবে ।তখন একা একা ঠাকুরের দোকানে যেতে শিখে গেছি । কিন্তু কি করে খাবো ?! সমাধান সহজ । আব্বার পকেটে পয়সা । সিকি চিনি ,আধুলি চিনি , দুই পয়সায় চারটি নারকেলের নাড়ু পাওয়া যায় তাও জানি । যোগ বিয়োগ গুন ভাগ পারি কিনা মনে করতে পারছি না । ঠিক তখন আব্বার পকেট হাতরে একটা পয়সাও পেলাম  না । টাকার খোঁজ করলাম পেলাম না । দশ টাকা লেখা দু’দুটো চকচকে নোট পেলাম । একটা নিয়ে নিলাম । হিসাব করলাম বহুদিন ঠাকুরের দোকানে মিষ্টি খাওয়া যাবে নিশ্চিন্তে । রেল স্টেশনের বাজারে বুড়ির নাড়ু , বাকি ভাইয়ের বড় কুলফি সরে ভরপুর ,আল হেলালের রসমালাই আর রাবড়ি… আহ্ব হা…। আমাকে পায় কে ? রেল স্টেশনের পাশ দিয়ে লাশকাটা ঘরের পাশ দিয়ে যেতেই শরীরে ঝাকুনি লাগে ভয়ে । ঠিক তখন বুদ্ধিতে ঝাঁকিটা লাগে …ধরা পড়লে কি হবে ? ইশান স্কুলের বিশাল লাল বিল্ডিং বিশাল মাঠ আমাকে পথ দেখাতে পারে না,ধরা পড়লে কি হবে ? মনে মনে নানা রকম চিত্রনাট্য সাজাতে থাকি বাঁচার জন্য । আশার আলো খুঁজতে থাকি, পাইনা । ইশান স্কুলের মাঠ পেড়িয়ে জেলখানার উঁচু দেয়ালের পাশ ঘেঁষে ঠাকুরের দোকানে গিয়ে চারটা রাজভোগের অর্ডার করি । ঠাকুর অবাক হয়ে তাকায় আমার দিকে । নিজেকে চোর চোর মনে হয় । মিষ্টি এসে যায় ,একটা খাওয়ার পর পকেটে দশ টাকায় হাত দিয়ে ধরে সাহস সঞ্চয় করি । দু’টো রসগোল্লা আর খেতে পারিনা । মনে হয় সবাই যেন দেখছে আমাকে । আমি যেন এক মহা চোর । সবাই যেন আমাকেই দেখছে । ঠাকুর তো আমাকে বার বার দেখছে আর মুচকি মুচকি হাসছে । হাসি তো নয় যেন চাবুক মারছে । আমার ভিতরটা ঠাকুরের হাসি-খুশিখুশি ভাব ক্ষত বিক্ষত করছে  । উঠে গিয়ে বিল দিতে গেলে ঠাকুর চমকে উঠে । ‘দশ টাকা ! কোথায় পেলে !!’ আমার অভিনয় শুরু তখন থেকে । আমি ভয়কে জয় করে বলি ‘মামা দিয়েছে ।’ ঠাকুর বলে ‘মিষ্টি যে খেলে না ।’ কোন রকমে বলি ‘পারছি নাহ , কাউকে দিয়ে দিয়েন ।’ সামনে একটা পাগল গ্যাঁট হয়ে বসে ছিল । বললাম ঐ পাগলটাকে দিয়ে দেন । ঠাকুর একজনকে বলল ‘এই মিষ্টি দুটো ঐ মজনুকে দিয়ে দে…।’ পাগলটার নাম মজনু,মনে মনে বলি । হঠাৎ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত । মজনু পাগল মিষ্টির প্লেট নেড়ে চেড়ে দেখছে , আর চোখে মুখে যেন রাগ ঠিকরে বের হচ্ছে । আচানক আমাকে তাজ্জব করে মিষ্টির প্লেট ছুঁড়ে মারে রাস্তার মাঝখানে । একটা মিষ্টি লং জাম্প দিয়ে একজনের পেটে গিয়ে লাগে । তার সাদা পায়জামা রাস্তার মাটি মিষ্টির সঙ্গে লেগে দেখার মত অবস্থা । লোকটার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা দেখতে দেখতে যেন সেই চোখে মুখেও রাগ ঠিকরে বের হচ্ছে । ঠাকুর বলে ‘এইযে বাবু টাকা নাও ।’কাঁপা কাঁপা হাতে টাকা নেই । মনে তখন রাজ্যের কথা দৌড় ঝাঁপ খেলছে । পাগলরা সব বুঝতে পারে । ঐ মজনু পাগল নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে ওইটা চুরি করা টাকা দিয়ে কেনা মিষ্টি । ভয়ে যেন পালিয়ে বাঁচি কোন রকমে । হাটতে হাটতে আল-হেলাল হোটেলের পাশ দিয়ে কখন চলে এসেছি স্টেশন রোডে বুঝতে পারিনি । অথচ প্ল্যান ছিল আল হেলালের রসমালাইয়ের রস গ্রহণ করবো । হাই স্কুলের পাশ দিয়ে জেলা স্কুলের পিছনে যে বিশাল মাঠ তার মাঝখানে গিয়ে শুয়ে পরলাম ,ক্লান্ত বিধ্বস্ত তখন আমি । নিজেকে চোর ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারছি না । সবাই যেন বুঝতে পারছে আমি চোর । এটা মন থেকে দূর করতে পারছি না । কিছু কিনতে পারছি না । মানুষের চোখ থেকে বাঁচার জন্যই এই পালাই পালাই অবস্থা,যা লাশ কাটা ঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময় মাথায় ঢুকেছিল । সেই ভয়…বাড়ির মানুষের চোখ কি করে ফাঁকি দিবো । মনে মনে কত শত চিত্রনাট্য সাজাতে থাকি , মনে মনে অভিনয় করতে থাকি…কিন্তু কোনটাই নিজের মনের মত হয় না । কোন এক সময় রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে চলে আসি, পাউরুটি কলা কিনি,কিন্তু গলা দিয়ে নামতে চায় না । হায়…এ কি সর্বনাশ করলাম । কেউ আমাকে গভীর ভাবে দেখলেই মনে হয় লোকটা আমাকে দেখছে কেন ? মুড়ি-মুরকি-নাড়ু-মিষ্টি কত কিছু খাই,টাকা যেন শেষ হতে চায় না । সন্ধ্যা ছুই ছুই,বাসায় ফিরে আসি কত শত ভাবে রিহার্সেল করে অনেক সাহসে ভর করে । বড় ঘরে ঢুকতেই দেখতে পাই দরজা থেকে ফুলের মালার মত করে স্যান্ডেল জুতা সাজানো,তার মাঝখানে একটা চেয়ার । আমার মেজো ভাই, পৃথিবীতে এই একটা মানুষই যেন আমাকে শাসন করার জন্য জন্মেছে । আমিও তাকে যমের মত ভয় করি । সে হাতের ইশারায় মাঝের চেয়ারটায় বসতে বলে । কোনো কথা নেই , ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছে সবাই । আমার অগ্রজ তিন বোন সেজো আপা,মেজো আপা,বড় আপা সবার সাথে দৃষ্টি বিনিময় হয় । অদ্ভুত তাদের মুখভঙ্গি । যা যা অভিনয় আয়ত্ত করে এসেছিলাম সব ভুলে গেলাম । মায়ের দিকে দৃষ্টি পড়তে যেন বুকের মধ্যের সমস্ত শক্তি সাহস পানি উধাও, গলা শুকিয়ে কাঠ । আকু-পাকু করছে মনের মধ্যে , আব্বা কই ? যে দরজা দিয়ে ঢুকেছিলাম সেই দরজার পাশে অন্ধকারে আব্বা বসা একটা হাতলআলা চেয়ারে । তখনও কারেন্টের সাথে আমাদের পরিচয় নেই,হারিকেনের আলো আঁধারে দূরে স্পষ্ট আব্বার মুখ । আমার দৃষ্টিতে যেন আকুল ব্যাকুল আবেদন ‘রক্ষা করেন আব্বা ।’ হঠাৎ দেখতে পেলাম আব্বার মুখে মিষ্টি মধুর হাসি । সারাদিন আমার ভিতরে যে চোরটা বসবাস করছিল তা যেন মুহূর্তেই হাওয়া । ঠিক তখন শুনতে পাই মেজো ভাই বলছে ‘যা যা বলব সত্যি সত্যি উত্তর দিতে হবে । তা না হলে এই আমাদের সবার জুতা স্যান্ডেল ,এই যে সাজানো,সব তোমার পিঠে পরবে । তুমি আব্বার পকেট থেকে টাকা নিয়েছ ?’ আমার সফল অভিনয় সার্থক,ভালো মানুষ সাজার সফলতম অভিনয় আমি উতরে গেলাম । ‘হ্যাঁ ।’ এক শব্দে স্বীকার করে নিলাম । তারপর ব্যাট বল খেলা চলে গেল সবার মধ্যে । আব্বা মূল প্লেয়ার তখন,আমি দুধ ভাত । আব্বা বলল ‘সে তো চুরি করেনি,চুরি করলে স্বীকার করত না ।’ না না গুঞ্জনের মধ্যে আব্বা আমাকে বলল ‘টাকাটা কি জন্য নিয়েছিলে ?’আমি বললাম ‘ঠাকুরের মিষ্টি খেতে ।’ আব্বা বলল ‘সেটা তুমি আমাকে বলতে পারতে আমি ব্যবস্থা করে দিতাম । বা আমার নাম করে খেতে, ঠাকুর তোমার কাছ থেকে টাকাই নিত না ।’ আমি বললাম ‘আরও আনেক কিছু খেতে ইচ্ছে করছিল ,সবাই আপনাকে আমাকে চিনে না ।’ আব্বা বলল, ‘কারো টাকা না বলে নিলে সেটা চুরি না হলেও অন্যায় ।’ কে যেন বলল ‘কত টাকার মিষ্টি খেয়েছিস ?’ আমি চুপচাপ,বলতে পারলাম না কিছুই । ‘কত আছে দেখি’,মেজো আপা সব নিয়ে  গেল । বলল ‘দুই টাকাও তো খরচ করতে পারিস নি ।’মা বলল ‘এই বয়সে চুরি,বড় হলে তো দেশের সেরা চোর হবে এই ছেলে ।’ আব্বা বলল ‘বার বার কেন চোর বলছ ,কেও আর চোর বলবে না । চুরি করলে কঠিন শাস্তি দিতাম ।’ ‘তাহলে ওর শাস্তি হবে না ?’ মেজো আপা বলল । ‘অবশ্যই হবে ’, আব্বা ঘোষণা দিল । আবার ভয় বাসা বাঁধল আমার ছোট্ট বুকে,যে ভয়কে সাথে করে সারাদিন ক্লান্ত বিধ্বস্ত । সেজো আপা বলল ‘কি শাস্তি আব্বা ?’ আব্বা বলল ‘টাকাটা ওকে ফেরৎ দিয়ে দাও । কাল সারাদিনের মধ্যে ওকে ওর পছন্দের খাবার খেয়ে টাকাটা খরচ করতে হবে ।’ মেজো আপা বলল ‘এটা কোনো শাস্তি হলো !’ আব্বা বলল ‘হলো,টাকা খরচ করা খুব সহজ কাজ না । কিন্তু সে টাকা দান করতে পারবে না , জামা কাপড় কিনতে পারবে না । শুধু পছন্দের খাবার কিনে খাবে,কাউকে খাওয়াতে পারবে না,এমন কি তোমাদেরও না । যদি খরচ করতে না পারে সবাই তোমাদের স্যান্ডেল দিয়ে কালকে মনের মতো জুতা পেটা করবে,বুঝতে পেরেছ ।’ বলে আব্বা চলে গেলেন । মেজো ভাই অনেক আগেই মনে হয় চলে গেছেন । যারা থাকল তাদের কাররই বিচারের শাস্তিটা যে পছন্দ হয়নি তা তাদের চেহারা দেখেই বোঝা গেল । বিশেষ করে মায়ের তো পছন্দই হয়নি । এই ঘটনার পর এক মাস পর্যন্ত সেটা হারে হারে টের পেয়েছিলাম । কিন্তু আমার অবস্থা কি বলব !? যেন নদীতে ছিলাম স্রোতের মধ্যে,এখন মনে হচ্ছে সাগরের অথৈ পানিতে ফেলে গেল আব্বা । সারা রাত ঘুমাতে পারলাম না দুশ্চিন্তায় । কিভাবে খরচ করবো এত টাকা ? কি খাবো এত টাকা দিয়ে ? না খেতে পারলে জুতার বারি খেতে হবে । হায়…হায়.. একি ত্রাহি অবস্থা আমার । সকালে সেজো আপাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি করে খরচ করব রে টাকাটা ?’ আপা বলল ‘ তুই  চোর । তুই আমার সাথে কথা বলবি না । চোরকে সাহায্য করা চুরির সমান ।’ ছুটে গেলাম মেজো আপার কাছে । ‘ওই আপা বল না কিভাবে খরচ করব ?’ আপা বলে ‘ চোরকে সাহায্য করলে আল্লাহ গুনা দিবে । তোরটা তুই চিন্তা কর ।’ বড় আপা বলল ‘ওই,চোর বলতে মানা করেছে না আব্বা ।’ মার কাছে গেলাম । ‘ও মা কি করবো ?’ মা বলল ‘তোর বাবা যে শাস্তি দিয়েছে তা আমার পছন্দ হয় নাই । আমার পক্ষের শাস্তি হল এক মাস আমার সাথে কথা বলবি না । বললে জুতা পেটা করবো মনে থাকে যেন ।’ মা ঝামটা দিয়ে চলে গেল নিজের কাজে । মহা ফাঁপরে হাবু-ডুবু খেতে খেতে উঠানের মাঝখানে পেয়ারা গাছের ঝুলানো ডালটায় গিয়ে বসলাম । শান্তি নেই , যেন বিপদের হাত থেকে মহা বিপদে পরে যাচ্ছি বারবার । সেজো আপা চা আর মুড়ি দিয়ে গেল মহা তাচ্ছিল্যের সাথে । চায়ের মধ্যে মুড়ি গুলো পুরপুর শব্দ করে চুপসে যাচ্ছে । আমার অবস্থাও এই তরতাজা মুড়ি গুলোর মতো । মুড়ির মতোই আমি ক্রমান্বয়ে চুপসে যাচ্ছি । আর কতশত সহস্রবার মনে মনে বলছি জীবনে আর যদি কোনদিন চুরি করি…। বারবার নিজেই নিজের কান মুলি,নাকে খত দেই । মুড়ি চা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই,আমি একটা চুমুকও দেইনি । ঠিক তখন বড় আপা পিছন থেকে এসে আমার মাথাটা জড়িয়ে ধরল তার বুকের সাথে । ঝর ঝর করে গড়িয়ে পড়লো আমার সমস্ত কষ্ট চোখের পানিতে । কেঁদে কেঁদে বললাম ‘জীবনে আর কখনও চুরি করবো না, না বলে কারো জিনিস ছুঁয়ে দেখবো না । আমি খুব কষ্ট পেয়েছিরে আপা । কাল সারাদিন কষ্টে ছিলাম,আজ আরও বেশি কষ্টে আছি ।’আপা বলল,‘ধুর বোকা তুই টাকা খরচ করতে ভয় পাচ্ছিস ?’ আমি বললাম ,‘পাব না ?!’ আপা বলল,‘টাকা খরচ করা খুব সহজ কাজ ।প্রথমে তুই তোর পছন্দের খাবার খাবি,তারপর কিনেও আনবি । তুই বলবি আমি কাল খাবো,পরশু খাব,তারপরদিন খাবো ।দুই কেজি গরুর মাংস কিনবি,বড় বড় মাছ কিনবি । তারপর যে টাকা বাঁচে সেটা দিয়ে পোলাউ এর চাল কিনবি । তারপর রিক্সা নিয়ে বাসায় চলে আসবি ।’

আমি যেন মহা মন্ত্র পেয়ে গেলাম । ঝটকেপট চা শেষ করে একটা রিক্সা নিয়ে চলে গেলাম ঠাকুরের দোকানে ।গিয়ে একটা কালো-জাম আর দুটো রাজভোগের অর্ডার দিলাম । ঠাকুর পরামর্শ দিল একটা নিমকি নিতে,সঙ্গে এও বলল নিমকি থাকলে গলা ধরে আসবে না আর কালকের মতো নষ্টও হবে না । পরান ভরে রাজভোগ নিমকি কালোজাম খেলাম । পাগলটা আজও বসে আছে । ভাবলাম ওর জন্যও অর্ডার করি, দেখি আজ ফেলে দেয় কিনা । কিন্তু মনে পড়লো আব্বা বলেছিল কাউকে খাওয়ানো যাবেনা । তারপর দুই কেজি রসগল্লা অর্ডার করলাম আর সাথে নিমকি ।বিল দিয়ে চলে এলাম আল হেলালের হোটেলে ।এক কেজি রাবড়ি, এক কেজি রসমালাই অর্ডার করলাম । রাবড়ি দিতে একটু দেরি হবে দেখে  আমি রসগোল্লা আর নিমকি রেখে আব্বার অফিসে গেলাম । আব্বার অফিস কাছেই । অফিসের বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করলাম ,ভিতরে ঢুকতে গেলে আবার ভয় বাসা বাঁধল । কিন্তু আব্বার চোখে চোখ পরতেই সেই মিষ্টি মধুর হাসি দেখলাম আব্বার মুখে । আমাকে দেখে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল ‘কি আব্বা কোন সমস্যা ?’ যেন কালকের কথা আর আমার যে শাস্তি চলছে তা ভুলেই গেছে । আমি মাথা নেড়ে বললাম যে কোন সমস্যাই না, রাবড়ি আর রসমালাই কিনতে এসেছি । খুব ভালো বলে আব্বা চলে গেলেন । আমি আল-হেলাল হোটেল থেকে রাবড়ি আর রসমালাই কিনে একটা রিক্সায় উঠলাম, স্টেশন রোডে এসে হাইস্কুলের কাছে মাংসের দোকানের সামনে রিক্সা থামিয়ে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম,‘কত টাকা কেজি চাচা ?’ সে বলল ‘কয় কেজি নিবা ?’ আমি বললাম, ‘দুই কেজি ।’ সে বলল যে  তিন টাকা । আমি যেন আকাশ থেকে পরলাম ।আমি বললাম, ‘তিন টাকা !!’ সে বলল, ‘ঠিক আছে যাও চার আনা কম দিয়ো ।’ আমি ভাবলাম দাম আরও বেশি হবে,টাকাও দ্রুত শেষ হবে । যাই হোক আমি দুই কেজি মাংস নিয়ে স্টেশন রোডের বাজারে গেলাম ,রিক্সা নিয়েই । রিক্সাওয়ালা আব্বার পরিচিত,আমাকেও চিনে । মাছের বাজারে গিয়ে দেখলাম তেমন কোন বড় মাছ নেই । হাত দেড়েকের একটা আইর মাছ দেখে দাম জিজ্ঞেস করলাম । দাম এক টাকা । আমি স্বভাবগত অভ্যাসে অবাক হয়ে বললাম, ‘ এক টাকা ! কম হবে না ?’ মাছয়ালা বলল, ‘আচ্ছা চার আনা কম দিও ।’ মাছ কেনার পর বুড়ির কাছ থেকে নাড়ু মুড়কি কিনলাম । বাকি টাকা নিয়ে পোলাউ এর চাল কিনতে গেলাম । গিয়ে দেখি খুব সুন্দর পরাঙ্গি ধানের ঢেঁকি-ছাটা চাল আছে । এটা আব্বার পছন্দের চাল । এক টাকা ও কিছু পয়সা রেখে বাকি টাকা দোকানিকে দিয়ে বললাম,‘এই টাকায় যতটুকু চাল হয় দিয়ে দেন ।’ দোকানি চাল মেপে এক ছেলেকে বলল ,‘এই বাবুর সদাইগুলো রিক্সায় তুলে দে ।’ সেই ছেলেটি মাছ আর চাল তুলে দিল রিক্সায় । মহা নির্ভার মনে হল নিজেকে ।

বাসার সামনে রিক্সা থেকে নামতেই ছুটে এল বড় আপা । রিক্সাওয়ালা সদাই গুলো বাড়ির ভিতর পৌঁছে দিল । মিষ্টির হাড়ি দেখে মহা খুশি হল ছোট বোন কল্পনা । বড় আপা সেজো আর মেজো আপাকে বলল, ‘খাবি নাকি মিষ্টি ?’ ওদের চোখে মুখে লোভ কিন্তু আগ্রহ দেখাল না । মা মাছটা দেখে খুশি হল কিনা বোঝা গেল না । ততক্ষনে কল্পনা মিষ্টির হাড়ির উপরের কাগজ ছিড়ে একটা প্লেটে সব মিষ্টি তুলছে । এটা দেখে আমার যে কি আনন্দ হল বলে বোঝানো যাবে না । হঠাৎ মেজো আপা বলল, ‘কিরে আর চুরি করবি ?’ কিরা-কসম,মায়ের দিব্বি,বড় আপার দিব্যি দিয়ে বললাম আর কক্ষনো করবো না । তারপর আমাকে তাজ্জব করে দিয়ে এক গ্লাস কাঁচা দুধ ঢেলে দিল আমার মাথায় । আর বলল “মনে থাকে যেন” । আজও আমি মনে রেখেছি সেই কথা । তারপরে পুকুরে নিয়ে ঘসে-মেজে গোসল করিয়ে পবিত্র করল আমাকে ।

সেই পবিত্রতা দিয়ে আজকের সমাজ ব্যবস্থাকে দেখছি । অল্পতেই মানুষ শতশত হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাচ্ছে । ১-১১ এর সময় পত্রিকায় পরেছি পার্কে,রাস্তায়,নদীর পাড়ে বস্তাভরা টাকা পরে আছে ;কে বা কারা যেন ভয়ে এ কালো টাকা ফেলে গেছে  । সরষের মধেই ভূত,ভূতে ভরা বাংলা । ১-১১ এর কুশীলব যারা তারাও অনেকে নাকি অনেক অনেক টাকা মেরে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে । সত্য মিথ্যা জানি না ।                                                                                                                                                                    সত্য হচ্ছে এই যখন এইসব ঘটনা আমাকে কষ্ট দেয় তখনই ওই লোকটার কথা মনে পড়ে “আমার বাংলা আমার হাতে ফেরত চাই,বাংলা চাই,অন্য কিছু না ।” আমি যদি আমার বাংলা আমার মতো করে আমার হাতে পেতাম তাহলে মারাধরা নয়, আমার বাবার মতো শাস্তি দিতাম যে একদিনে সব টাকা খরচ করতে হবে । দান করা যাবেনা, কাউকে কিছু খাওয়ানো যাবে না । আর খরচ করতে না পারলে সমস্ত দেশবাসী জুতা পেটা করবে মনের আনন্দে ।

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *